ডানকুনি সিদ্দিকিয়া সিনিয়র মাদ্রাসার শিক্ষক ‘সুভাশীষ সাহার’ বিদায় সম্বর্ধনা অনুষ্ঠানে ঘনীভূত হল বেদনাতুর মুহুর্ত
সেখ জিন্নাত আলি, বিবি নিউজ, ডানকুনি, ৩১শে জানুয়ারি ২০১৯ : আজ ডানকুনি সিদ্দিকিয়া সিনিয়র মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হল বিদায়ী শিক্ষক সুভাশীষ সাহার সম্বর্ধনা অনুষ্ঠান। কেরাত পাঠের মধ্যে দিয়ে শুরু হয় আজকের অনুষ্ঠান। কেরাত পাঠ, গজল পরিবেশনা, সমবেত কন্ঠে গজল পরিবেশনা সহ একাধিক বক্তব্যের মাধ্যমে ফুটে ওঠে শিক্ষক সুভাশীষ সাহার এই মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করার ২৬ বছরের কর্মময় জীবনের কিয়দংশ।
এদিনের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মাদ্রাসা পরিচালন সমিতির সদস্যবৃন্দ, মাদ্রাসার শিক্ষক-শিক্ষিকা,শিক্ষাকর্মীবৃন্দ, মাদ্রাসার বর্তমান ও প্রাক্তন ছাত্র-ছাত্রীবৃন্দ, অভিভাবক-অভিভাবিকাবৃন্দ এবং এলাকার শুভানুধ্যায়ী মানুষ।
এদিনের অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন শিক্ষক আরিফ হালদার, শিক্ষিকা সুপর্না মন্ডল, শিক্ষক সফিউল ইসলাম, শিক্ষক তথা মাওলানা আব্দুল কাইয়ুম সাহেব, প্রধান শিক্ষক সৈয়দ সাফাকাত হোসেন সাহেব, মাদ্রাসা পরিচালন সমিতির সম্পাদক হাসান মন্ডল, ডাঃ আলহাজ্ব সালিবুর রহমান সাহেব, মাদ্রাসা পরিচালন সমিতির সদস্য সারাবত মোল্লা, মনোহরপুর মডেল প্রথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক প্রবীর সাহা, বিক্রমশীলার এডুকেশন ডিরেক্টর ববিতা মজুমদার প্রমুখ।
শিক্ষক আরিফ হালদার তার বক্তব্যে বলেন, “শিক্ষক সুভাশীষ সাহা ১৯৯৩ সালে এই মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করতে যোগদান করেন। প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে উনি সমস্ত কাজের ক্ষেত্রে সহযোগিতা করেছেন। তার ব্যবহারে শিক্ষক শিক্ষিকা সহ ছাত্র-ছাত্রীদের সকলেই আপ্লুত। দীর্ঘ ২৬ বছরে তিনি প্রতিষ্ঠানের প্রতি দায়বদ্ধতা মেলে ধরার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন। তাই তার বিদায় আমাদের কাছে বেদনার।”
মাদ্রাসা পরিচালন সমিতির সম্পাদক হাসান মন্ডল বলেন, “সাহাবাবু একজন অমায়িক মানুষ। তিনি এতই ভালো মানুষ যে তার বিদায়ের দিনে এলাকার মানুষ থেকে শুরু করে ছাত্র-ছাত্রীরা এবং অভিভাবকেরাও তার প্রশংসা করছেন। তিনি ধর্মের গন্ডি পেরিয়ে মাদ্রাসার জন্য নিজেকে উজাড় করে দিয়েছেন।”
ডাঃ আলহাজ্ব সালিবুর রহমান বলেন “তিনি ধর্মে হিন্দু হলেও মাদ্রাসার মত প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘ ২৬ বছরে তার ধর্ম পরিচয়ের চেয়ে তার কর্তব্য, নিষ্ঠা, আদর্শ সব সময় ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে বড় হয়ে উঠেছে।”
মাদ্রাসা পরিচালন সমিতির সদস্য সারাবত মোল্লা স্বরচিত কবিতা পাঠের মাধ্যমে বলেন, “মানুষের আগমন যেমন আনন্দ মুখর হয় তেমনি তার বিদায় মুহুর্তও হয় বেদনাদায়ক। আজকে শিক্ষক সুভাশীষ সাহার বিদায় শুধু ছাত্র-ছাত্রী নয় শিক্ষক-শিক্ষিকাদের কাছেও খুবই বেদনার।”
মনোহরপুর মডেল প্রথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক প্রবীর সাহা বলেন, “একজন শিক্ষক মহাশয় ছাত্র-ছাত্রীদের সন্তান স্নেহে পড়া শোনা করতে সহযোগিতা করেন। শিক্ষকরা হলেন মানুষ গড়ার কারিগর। সুভাশীষ বাবুও শিক্ষার্থীদের খুবই স্নেহ করতেন।”
বিক্রমশীলার এডুকেশন ডিরেক্টর ববিতা মজুমদার বলেন, ” আমাদের সমাজে শিক্ষকদের একটি বিশেষ জায়গা আছে। মাদ্রাসা বেসড ওয়ার্কশপ গুলিতে উনি যথেষ্ট সহযোগিতা করতেন। সহযোগিতা এবং সৌজন্যের ক্ষেত্রে উনি একটি উদাহরণ তৈরি করেছেন। সাফাকাত হোসেন সাহেবেরও উনি ভুয়োসী প্রশংসা করেন আই টি তে পশ্চিমবঙ্গে রোল মডেল হওয়ার জন্য।”
শিক্ষিকা সুপর্না মন্ডল বলেন, “ওনার মধ্যে সকলকে আপন করে নেওয়ার ক্ষমতা ছিল। আমাকে নিজের বোনের মত মনে করতেন। আমিও ওনাকে নিজের দাদা মনে করি এবং আগামীতেও তাই করবো।”
শিক্ষক সফিউল ইসলাম বলেন, “পড়াশোনা করার সাথে সাথে চরিত্রে গঠন করাও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। শিক্ষক-শিক্ষিকাদের প্রাথমিক কর্তব্য হল ছাত্র-ছাত্রীদের ভালো ভাবে পড়াশোনা করানোর সাথে সাথে চরিত্র গঠনেও সাহায্য করা। আর মাদ্রাসার সকল শিক্ষক-শিক্ষিকাদের সাথে সুভাশীষ বাবুও এই কাজটি গুরুত্ব দিয়ে করতেন।”
শিক্ষক তথা মাওলানা আব্দুল কাইয়ুম সাহেব বলেন, “মানব জীবন অনেক ঘটনার সমন্বয়ে গঠিত। সুভাশীষ বাবুর শিক্ষকতা জীবনও ছিল বৈচিত্র্যময়।”
ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সৈয়দ সাফাকাত হোসেন বলেন “আজ সুভাশীষ সাহার ২৬ বছরের ইতিহাস এই মাদ্রাসার সাথে জড়িয়ে গেছে। মানুষ ভূমিষ্ঠ হলে মৃত্যু নিশ্চিত হয়ে যায়। শুধু মৃত্যুর তারিখটি জানা থাকেনা। কিন্তু একজন চাকরি প্রার্থী জানে চাকরি গ্রহন করার সাথে সাথেই জানতে পারে তার বিদায়ের তারিখ তথা অবসরের তারিখ। সাহাবাবুও এর ব্যতিক্রম নয়। তবে তিনি ছিলেন শান্ত, ধীর এবং কর্মপরায়ন মানুষ। তার চরিত্র এবং আচরণ ছিল শিক্ষণীয়। ১১০০ ছাত্র-ছাত্রী সহ সকল শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীরা সুভাশীষ বাবুকে আন্তরিক ভাবে শুভেচ্ছা জানাচ্ছে। তিনি শিক্ষকতার পাশাপাশি মাদ্রাসার প্রশাসনিক কাজকর্মে যথেষ্ট সহযোগিতা করতেন।”
বিদায় প্রাপ্ত শিক্ষক সুভাশীষ সাহা বলেন “মাদ্রাসার শিক্ষকতা করতে গিয়ে আমার কখনও মনে হয়নি যে আমি অন্য ধর্মের মানুষ। এই মাদ্রাসায় দীর্ঘ ২৬ বছর কর্মরত থেকে আমি আল্লাহর কাছে সবসময় মাদ্রাসা এবং মাদ্রাসার শিক্ষার্থী এবং শিক্ষক-শিক্ষিকাদের ভালো চেয়েছি এবং ভালো চাইবো। আমি অন্য ধর্মের মানুষ হয়ে মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করার জন্য অনেকের প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছি। অনেকে জানতে চেয়েছে আমি সেখানে কেমন করে শিক্ষকতা করছি ? কোন অসুবিধা হচ্ছে কিনা ? অথচ আমি জানি এই মাদ্রাসার সকলে কত আন্তরিক, আমার সহকর্মী থেকে শুরু করে সকল ছাত্র-ছাত্রীরা আমার সুখ দুঃখে সমব্যথী। ধর্মের এখানে কোনো বেড়া নেই। আছে শুধু হৃদয়ের বাঁধন।”
আজকের সম্বর্ধনা অনুষ্ঠানে বিদায়ী শিক্ষক সুভাশীষ সাহাকে মাদ্রাসার পক্ষ থেকে মানপত্র এবং উপহার দেওয়া হয়, উপহার দেওয়া হয় পরিচালন সমিতি, শিক্ষক-শিক্ষিকা, প্রথম শ্রেণী থেকে ফাযিল শ্রেনি পর্যন্ত ছাত্র-ছাত্রী, প্রাক্তন ছাত্র-ছাত্রী, অভিভাবক মন্ডলীর পক্ষ থেকে।
বেদনাঘন সম্বর্ধনার এই অনুষ্ঠান দোয়ার মজলিস তথা মোনাজাতের মাধ্যমে সমাপ্ত হয়।